ডেস্ক রিপোর্ট
ঈদের আনন্দ পরিবারের সঙ্গে ভাগাভাগি করতে বাড়ি ফিরছিলেন দুই ভাই। বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধী মা-বাবার মুখে হাসি ফোটানো, গর্ভবতী স্ত্রীর জন্য নতুন কাপড় কেনা আর পরিবারের সঙ্গে ঈদ কাটানোর স্বপ্ন ছিল তাদের চোখে। কিন্তু সেই ফেরা আর হলো না। টাঙ্গাইলের ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা কেড়ে নিয়েছে নওগাঁর মান্দা উপজেলার পাকুড়িয়া গ্রামের সহোদর মাইনুর রহমান (২৫) ও গিয়াস উদ্দিনের (২২) প্রাণ।
দুই ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে শোকে পাথর হয়ে গেছেন বাকপ্রতিবন্ধী বাবা আব্দুর রশিদ। আর শারীরিক প্রতিবন্ধী মা জাইরন বিবি। বারবার মুর্ছা যাচ্ছেন সন্তানের শোকে। তাদের ছোট্ট সংসারে এখন শুধু কান্না আর আহাজারি।
স্থানীয়রা জানান, মান্দা উপজেলার ভারশোঁ ইউনিয়নের পাকুড়িয়া গ্রামের আব্দুর রশিদের পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরেই অভাব-অনটনের সঙ্গে লড়াই করে আসছিল। বাকপ্রতিবন্ধী বাবার পক্ষে নিয়মিত কাজ করা সম্ভব ছিল না। শারীরিক প্রতিবন্ধী মাও ছিলেন অসহায়। পরিবারের দায়িত্ব তখন কাঁধে তুলে নেয় দুই ছেলে মাইনুর ও গিয়াস। মাত্র দুই মাস আগে জীবিকার সন্ধানে তারা নোয়াখালীর বিভিন্ন এলাকায় যান। সেখানে গ্রামেগঞ্জে ঘুরে প্লাস্টিকের পণ্যের বিনিময়ে চুলসহ বিভিন্ন জিনিস সংগ্রহ ও ফেরির ব্যবসা করতেন। সামান্য আয়ে চলছিল পুরো পরিবার।
এরই মধ্যে বড় ছেলে মাইনুর রহমানের সংসারে আসে নতুন সুখবর। তার স্ত্রী সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। অনাগত সন্তানের মুখ দেখার স্বপ্নে বিভোর ছিলেন মাইনুর। পরিবারের লোকজনও অপেক্ষা করছিলেন নতুন অতিথিকে ঘিরে। অন্যদিকে ছোট ভাই গিয়াস উদ্দিন ছিলেন অবিবাহিত। পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন ছিল তারও।
ঈদ সামনে রেখে দুই ভাই বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নেন। স্বল্প খরচে বাড়ি ফেরার জন্য খুঁজছিলেন সস্তা পরিবহন। পরে জনপ্রতি ৩৫০ টাকার বিনিময়ে রডবোঝাই একটি ট্রাকে নওগাঁর উদ্দেশে রওনা দেন তারা। কিন্তু পথেই টাঙ্গাইলে ঘটে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। মুহূর্তেই নিভে যায় দুই ভাইয়ের জীবন।
পাকুড়িয়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, দুই ভাইয়ের মৃত্যুর খবরে পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। বাড়ির উঠানে স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। প্রতিবেশীরা বলছেন, পরিবারের একমাত্র ভরসা ছিলেন এই দুই ভাই। তাদের মৃত্যুতে পরিবারটি এখন একেবারে অসহায় হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় নাসির উদ্দীন বলেন, বাবা কথা বলতে পারেন না, মা চলাফেরা করতে পারেন না। দুই ছেলেই ছিল পরিবারের একমাত্র সম্বল। এখন এই পরিবার কীভাবে চলবে, তা ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে।
আরেক প্রতিবেশী বলেন, মাইনুরের ঘরে কয়েক মাস পর সন্তান জন্ম নেবে। কিন্তু সেই সন্তান জন্মের আগেই বাবা হারালো। এমন কষ্টের ঘটনা এই গ্রামে খুব কমই দেখা গেছে।
এদিকে এলাকাবাসী নিহতদের মরদেহ দ্রুত গ্রামের বাড়িতে ফিরিয়ে আনা এবং পরিবারটির জন্য সরকারি সহায়তার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, এত বড় শোক ও আর্থিক বিপর্যয়ের পর পরিবারটি টিকে থাকতে জরুরি সহায়তা প্রয়োজন।
মান্দা থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খোরশেদ আলম বলেন, টাঙ্গাইলের সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৯ জনের তথ্য মান্দা উপজেলার বলে আমরা জেনেছি। আইনগত প্রক্রিয়া শেষ করে মরদেহগুলো দ্রুত ফিরিয়ে আনতে সেখানকার থানা পুলিশের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত আছে।
প্রসঙ্গত, সোমবার (২৫ মে) ভোর ৪টার দিকে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কালিহাতিতে রডবোঝাই একটি ট্রাক উল্টে ১৫ জন নিহত হয়েছেন। মহাসড়কের সরাতৈল দক্ষিণপাড়া এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা সকলেই পরিবারের সদস্যদের সাথে ঈদ করার উদ্দেশে বাড়ি ফিরছিলেন।
