ডেস্ক রিপোর্ট
বয়স যখন আড়াই বছর তখন বাবাকে হারায় শিশু মো. আতিক। সর্বশেষ গত ৬ বছর আগে মাকেও হারিয়ে আশ্রয় পান নানির কাছে। এসএসসি পরীক্ষার পাশের পর ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হলেও পড়াশুনার এগোয়নি। অনেকটা অভিমান নিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতেই ১৭ বছরের তরুণ আতিক এখন চাকরি করেন শাহ সিমেন্টে।
বাড়ি যাওয়ার কথা ছিল না আতিকের। তবে আজি সিদ্ধান্ত হয়েছে বাড়ি ফিরবে। কারণ নানির ফোন। আজ দুমাস পর অভিমান ভেঙে তাই হানিফ পরিবহনের বাসে নওগাঁ নিয়ামতপুরের বাড়িতে ফিরছেন আতিক।
কল্যাণপুর বাস টার্মিনালে কথা হয় আতিকের সঙ্গে। কথায় কথায় উঠে আসে বাবা-মা হারানোর পর নানির আদর অন্যদিকে দাদার বাড়িতে বঞ্চনার কথাও।
আতিক বলছে, আমি তো এতিম। বাড়ি যাবোই না ভাবছিলাম। নানির ফোন আসলো। আর অভিমান রাখতে পারলাম না। কারণ মায়ের মৃত্যুর পর নানীই মানুষ করছেন আমাকে। ঈদটা নানির কাছেই করবো। কুরবানি হবে ছাগল। মায়ের হাতের রান্না যার হাত ধরে শেখা তার হাতেই কুরবানির গোশতো খাবো, এটা ভেবেই ভালো লাগছে।

শুধু আতিক নয়, তরুণ বয়সে পরিবারের হাল ধরা হাজারো যুবকের গন্তব্য আজ অন্যদের মতোই গ্রামের বাড়ি। ঈদযাত্রার ভোগান্তি, কষ্ট ছাপিয়ে ঘরমুখো মানুষের আবেগ যে নাড়ির টান।
গ্রামের মানুষের ঈদ মানেই সত্যিই যে নাড়ির টান। বছরের পর বছর কর্মব্যস্ত শহুরে জীবনে ক্লান্ত মানুষগুলোর কাছে ঈদ যেন এক টুকরো স্বস্তি, পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার উপলক্ষ্য।
সেই টানেই রাজধানী ঢাকা ছাড়তে শুরু করেছেন লাখো ঘরমুখো মানুষ। রাজধানীর কল্যাণপুর, শ্যামলী টেকনিক্যাল বাস টার্মিনাল, কাউন্টার, মহাসড়ক সবখানেই এখন বাড়ি ফেরার উচ্ছ্বাস আর প্রিয়জনকে কাছে পাওয়ার অপেক্ষার গুঞ্জন।
সোমবার (২৫ মে) রাতে রাজধানীর কল্যাণপুর বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা গেছে মানুষের ঢল। কেউ যাচ্ছেন রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া, গাইবান্ধা কিংবা কুড়িগ্রামে। আবার কেউ ছুটছেন বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা, খুলনা বা যশোরে। ব্যাগভর্তি কাপড়, শিশুদের কোলাহল আর মুখভর্তি হাসি, স্বজনে, প্রিয়জনে খোশগল্পে জমে উঠেছে ঈদযাত্রা। যানজট ভোগান্তি-বৃষ্টির শঙ্কা উপেক্ষা করে ঈদযাত্রার যাত্রীরাও কাউন্টারে পৌছাচ্ছেন সময় হাতে নিয়েই। গন্তব্যের বাসও অধিকাংশ সময়মতো ছেড়ে যাচ্ছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক্সপ্রেসে একসঙ্গে ফিরছেন সাতজন। তাদের মধ্যে ৫ জনের বয়সই আঠারোর নিচে। তাদেরই একজন সানাউল্লাহ। তার গন্তব্য চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল মল্লিকপুরে।
সানাউল্লাহ জানায়, বড় দুই বোন বাসায় অপেক্ষায় ছোট ভাইটা ফিরবে। এতক্ষণে দুবার কল দিয়ে খবর নিয়েছে।
বয়সে পরিবারের ছোট হলেও দায়ে যেন সবার বড় সানাউল্লাহ। ক’মাস হলো রাজমিস্ত্রীর কাজ নিয়েছেন তিনি। থাকা-খাওয়া ফ্রি, সঙ্গে মাস গেলে ১৬ হাজার টাকা।
কাঁপাস্বরে সানাউল্লাহ বলছিলেন, আমাদের মতো নিম্নবিত্তের ঈদ মানে গ্রাম, স্বজন, মা-বাবা ভাইবোনের সাক্ষাৎ আর মেঠোপথ ধরে ক’টা দিন হৈ-হুল্লোড়ের উপলক্ষ্য। সেটা মিস করা মানে মনঃকষ্ট, যাতনা। বাবা কৃষক, মা গৃহিণী। আমিই এখন পরিবারের হাল ধরেছি। বাবা কিছু রোজগার করে, তাতে সংসার চলে যায়, আমারটা মা জমাচ্ছে। সামনে যে অনেক দায়িত্ব।
একই গ্রামের একই সঙ্গে ঢাকার আগারগাঁও বিএনপি বাজারে রাজমিস্ত্রীর কাজ করছে মো. রবিন। হাইস্কুলের পাঠ সুযোগ পাইনি। পরিবারের হাল ধরার চাপ তখন থেকেই। সাত বছর ধরে বাইরে বাইরেই কাজে ফেরারি জীবন রবিনের। তবে ঈদটাই বাড়ি ফেরার উপলক্ষ্য।
রবিন বলে, বাড়ি ফিরতেছি। অনেক পরিকল্পনা। হয়ত অনেক কিছুই করা সম্ভব হবে না। আবারও কাজে ফিরতে হবে ঢাকা। কিন্তু ওই যে টান মানে বাবা-মা, বোন। ওদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগটাই বা মিস করি কি করে?

সরেজমিনে দেখা যায়, অধিকাংশ বাস কাউন্টার যাত্রীর উপচে পড়া ভীড়। কল্যাণপুর বাস টার্মিনালের দেশ ট্রাভেলসের কাউন্টার খালিদ হাসান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ১৪/১৫টা শিডিউল বাস। গন্তব্য রাজশাহী নাটোর চাঁপাইনবাবগঞ্জ রুট। বাড়তি চাপ নেই, সড়কে এখনো যানজট নেই। তাই ভোগান্তিও নেই। নির্বিঘ্ন ঈদ যাত্রা এবার।
কিছু বাস আধা ঘণ্টা করে লেটে ঢাকা ফিরছে বলে জানান হানিফ এন্টারপ্রাইজের কল্যাণপুর বাস টার্মিনালের কাউন্টার মাস্টার মো. আতিফ। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, কিছু বাস লেটে আসলেও তাতে সিডিউলে চাপ পড়ছে না। বাকি সব বাস সময়মতো আসছে। সময় মতো ছেড়ে যাচ্ছে। তবে আজ প্রচুর চাপ। মহাসড়কে আজ যানজট না হলেই হয়!
টেকনিক্যালের শ্যামলী এনআর বাসের কাউন্টার মাস্টার আ. কাদের ঢাকা পোস্টকে বলেন, আজ সকাল থেকেই প্রচুর চাপ। অনেকেই আগেভাগে চলে এসেছেন। তবে ভালো বিষয় হচ্ছে, এখনো রাস্তায় বড় কোনো যানজট নেই। বাসগুলো সময়মতো ছাড়তে পারছে। আশা করছি যাত্রীরা নির্বিঘ্নে বাড়ি পৌঁছাতে পারবেন।
হানিফ পরিবহনের কাউন্টার ইনচার্জ রফিকুল ইসলাম বলেন, ঈদের আগে এমন চাপ নতুন কিছু না। কিন্তু এবার যাত্রীরা অনেকটা স্বস্তিতে আছেন। টিকিট নিয়ে আগের মতো বিশৃঙ্খলা নেই। মহাসড়কও এখন পর্যন্ত মোটামুটি ফাঁকা।
টেকনিক্যাল মাজাররোডে পরিবার নিয়ে বগুড়ার উদ্দেশে বাসের অপেক্ষায় বেসরকারি চাকরিজীবী রায়হান কবির। তিনি বলেন, এক বছর পর পুরো পরিবার নিয়ে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছি। শহরের ব্যস্ততায় পরিবারকে সময় দিতে পারি না। ঈদটাই আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় আনন্দ।
