ডেস্ক রিপোর্ট
কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে শেষ মুহূর্তে জমে উঠতে শুরু করেছে পার্বত্য জেলা রাঙামাটির পশুর হাট। জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে হাটে আসতে শুরু করেছে পাহাড়ি দেশি গরু। বিশেষ করে ‘লাল চাটগাঁইয়া’ বা ‘রেড চিটাগাং’ জাতের গরুর প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।
প্রতিদিন ভোর থেকে কাপ্তাই হ্রদের বিভিন্ন ঘাটে ভিড়ছে গরু বোঝাই ইঞ্জিনচালিত বোট। পাহাড়ি দুর্গম এলাকা থেকে বোটযোগে আনা এসব গরু নামানো হচ্ছে রাঙামাটি পৌর ট্রাক টার্মিনাল পশুর হাটে। পরে সেখান থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যাচ্ছেন ব্যাপারীরা।
পাহাড়ে খোলা পরিবেশে পালন করা হয় এসব পাহাড়ি দেশি গরু। বছরের বেশিরভাগ সময় এসব গরু পাহাড় ও জঙ্গলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো ঘাস, লতাপাতা ও বনজ খাদ্য খেয়ে বেড়ে ওঠে। ফলে অন্যান্য জাতের গরুর তুলনায় এসব গরুর দৈহিক গঠন অনেকটাই ভিন্ন হয়। গরুর শরীরে মাংস বেশি এবং চর্বির পরিমাণ তুলনামূলক কম থাকায় স্বাস্থ্য সচেতন ক্রেতাদের কাছেও এর চাহিদা বেশি।
কাদামাখা হাটে কোরবানির পশু, ভোগান্তিতে ক্রেতা-বিক্রেতারা
পাশাপাশি লালচে রঙ ও সুন্দর গঠনের কারণে কোরবানির হাটে সহজেই নজর কাড়ে পাহাড়ি এই গরুগুলো। কৃত্রিমভাবে মোটাতাজাকরণ বা ইনজেকশন ব্যবহার না করায় ক্রেতাদের আস্থাও বেশি।
স্থানীয় খামারিরা জানান, কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করেই মূলত সারা বছর এসব গরু লালন পালন করেন তারা। ঈদের বাজারে পাহাড়ি দেশি গরুর দাম তুলনামূলক ভালো পাওয়ায় বর্তমানে অনেক কৃষক ও খামারি এই জাতের গরু পালনে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।

বালুখালী এলাকা থেকে গরু নিয়ে আসা জিকো চাকমা বলেন, বর্তমানে বাজারে গরুর দাম গতবছরের তুলনায় অনেক কম। এ বছর প্রত্যাশা অনুযায়ী দাম পাওয়া যাচ্ছে না। পাহাড়ি গরুর চাহিদা বেশি থাকলেও ক্রেতারা তুলনামূলক কম দাম বলছেন। তার গরুগুলোকে কোনো ধরনের ইনজেকশন দেওয়া হয়নি। জঙ্গলে ঘাস ও লতাপাতা খেয়ে স্বাভাবিকভাবে বড় হয়েছে। তাই খামারের গরুর তুলনায় পাহাড়ি গরুর মান ভালো।
মাইনি করল্লাছড়ি থেকে আসা ব্যবসায়ী বেলাল বলেন, গত শনিবার তিনি ৪০টি গরু নিয়ে রাঙামাটির হাটে এসেছিলেন। এর মধ্যে ৩০টি গরু ইতোমধ্যে বিক্রি হয়েছে বাকি আছে আরও ১০টি। তিনি বলেন, পাহাড়ি লাল গরুর চাহিদা অনেক ভালো। কারণ এসব গরু পাহাড়ে ছেড়ে লালন পালন করা হয় এবং কোনো ধরনের ইনজেকশন বা ফিড ব্যবহার করে মোটাতাজা করা হয় না।
বাঘাইছড়ি থেকে আসা ব্যবসায়ী মো. নিজাম উদ্দিন বলেন, তিনি আজকে বাঘাইছড়ি থেকে ১২টি গরু নিয়ে রাঙামাটিতে এসেছেন এর মধ্যে ৩টি গরু বিক্রি হয়েছে। বাজারে গরুর দাম মাঝামাঝি পর্যায়ে রয়েছে। তবে, গত বছরের তুলনায় এ বছর দাম কিছুটা কম বলে জানান তিনি।
গরু কিনতে আসা ক্রেতা নাছির উদ্দিন সোহেল বলেন, দেখতে সুন্দর ও ভালো গরুগুলোর দাম তুলনামূলক বেশি চাওয়া হচ্ছে। তার দাবি, গত বছরের তুলনায় প্রতি গরুতে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি দাম চাওয়া হচ্ছে। তবে, ঈদের কাছাকাছি সময়ে দাম কিছুটা কমতে পারে বলেও মনে করেন তিনি।
আরেক ক্রেতা মো. রুবেল বলেন, বাজারে গরুর মান ভালো থাকলেও বিক্রেতারা এখনও দাম বেশি ধরে রেখেছেন। তিনি বলেন, বর্তমানে একেকটি গরুতে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি চাওয়া হচ্ছে। আজ গরু কিনতে এলেও দরদাম না মিললে ঈদের একদিন আগে কিনবে বলে জানান তিনি।
ট্রাক টার্মিনাল পশুর হাটের ইজারাদার নাজমুল হুদা বলেন, বর্তমানে হাটে পর্যাপ্ত পরিমাণে গরু নেই। জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা গরুর বড় একটি অংশ বাইরের ব্যবসায়ীরা ট্রাকে করে নিয়ে যাচ্ছেন। এতে স্থানীয় বাজারে গরুর সংকট তৈরি হচ্ছে এবং দামও বেড়ে যাচ্ছে। তবে সার্বিকভাবে হাটের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
রাজশাহীতে পশুর হাটে নজর কাড়ছে দুই বিপরীত আকৃতির গরু
রাঙামাটি জেলার পুলিশ সুপার মুহাম্মদ আব্দুর রকিব বলেন, আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষ করে পশুর হাটকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। যাতে ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা নির্বিঘ্নে পশু ক্রয় বিক্রয় করতে পারেন সে বিষয়ে পুলিশ কাজ করছে।
রাঙামাটি জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ড. আবু সাদাত মো. সায়েম বলেন, জেলার ১০টি উপজেলায় এ বছর কোরবানির জন্য ৫৩ হাজার ২৭২টি পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। বিপরীতে চাহিদা রয়েছে ৪৪ হাজার ৮৮২টি। সে হিসেবে জেলায় প্রায় ৮ হাজার ৩৯০টি পশু অতিরিক্ত রয়েছে। তিনি বলেন, জেলার বিভিন্ন পশুর হাটে পর্যাপ্ত সংখ্যক গরু রয়েছে এবং স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাহাড়ি দেশি গরু সরবরাহ করা হচ্ছে।
