ডেস্ক রিপোর্ট
দিনের রোদ-বৃষ্টির খেলা শেষে কালশী পশুর হাটে নেমেছে রাত, তবে জমে ওঠেনি বেচাকেনা। লাইটের আলোয় চকচক করছে গরুর পিঠ, কিন্তু বিক্রেতাদের চোখে-মুখে শুধুই হতাশার ছাপ। দিনভর গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি আর কাদায় নাজেহাল হওয়ার পর রাতে যখন হাটে উপচে পড়া ক্রেতার সমাগম হওয়ার কথা, তখনো চিত্রটা বেশ মলিন। পর্যাপ্ত পশু হাটে থাকলেও রাত বাড়ার সাথে সাথে ক্রেতার আনাগোনা উল্টো কমে গেছে। রোদ-বৃষ্টির খেলা শেষে যখন বেচাবিক্রি বাড়ার কথা ঠিক তখনই কালশী বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। বস্তির আগুনের কারণে কালশী সড়ক বন্ধ করে দিয়েছে প্রশাসন। এর প্রভাব পড়েছে গরুর হাটে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, গরুর হাটে যারা আসছেন, তাদের বেশিরভাগই দাম শুনে ফিরে যাচ্ছেন। বিক্রেতারা বলছেন, গোখাদ্যের চড়া দামের কারণে এবার উৎপাদন খরচই বেশি, অথচ ক্রেতারা অবাস্তব দাম বলছেন। এর মধ্যে সন্ধ্যার পর বস্তিতে আগুন ধরে ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। বস্তির আগুনের কারণে কোনো মানুষ চলাচল করতে দিচ্ছে না আর্মিরা। এজন্য খুবই ক্রেতা সমাগম কম।
অন্যদিকে ক্রেতাদের দাবি, বিক্রেতারা অযৌক্তিক বাড়তি দাম ধরে বসে আছেন, যার কারণে বাজেট মিলছে না। তবে আরও দুইদিন সময় থাকার কারনে হতাশ হচ্ছে না ক্রেতারা। প্রয়োজনে আরও বাজার ঘুরে নির্ধারিত বাজেটে গরু ক্রয়ের কথাও জানিয়েছে ক্রেতারা।
ফরিদপুরের কানাইপুর থেকে ৭টি গরু নিয়ে আসা রহমত আলী রাতের থমথমে হাট দেখে বেশ শঙ্কিত। তিনি একেকটি গরুর দাম হাঁকছেন এক লাখ ৭০ হাজার টাকা থেকে দুই লাখ ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত। কিন্তু রাতের বাজারেও ক্রেতারা গরু প্রতি ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা কম বলায় তার কপালে চিন্তার ভাঁজ।
রহমত আলী আক্ষেপ করে বলেন, হাটের যে অবস্থা দেখছেন, তাতে সব গরু বিক্রি করে বাড়ি ফিরতে পারবেন বলে মনে হচ্ছে না। দাম শুনেই ক্রেতারা হাঁটা দিচ্ছেন, সবার একই অজুহাত, বাজেট নেই। একই জেলা থেকে ১২টি গরু নিয়ে আসা কামাল উদ্দীন দিনের বেলায় ৩ লাখ ৯০ হাজার টাকায় মাত্র ২টি গরু বিক্রি করতে পেরেছেন। বাকি গরুগুলো দেড় লাখ টাকা থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকার মধ্যে ছাড়তে চাইলেও রাতের ক্রেতারা দাম তুলছেন মাত্র এক লাখ টাকা।
ঈদের আর মাত্র দুই দিন বাকি থাকলেও হাটে আশানুরূপ ক্রেতা না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে কামাল উদ্দীন বলেন, এখন যদি মানুষ গরু না কেনে, তাহলে আর কিনবে কবে? বিক্রি না হলে বাকি গরু নিয়ে বাড়ি চলে যাব।
তবে এই অচলাবস্থার মধ্যেও কিছু বিক্রি যে হচ্ছে না, তা নয়। চাকুরিজীবী রুবায়েত আহমেদ এক লাখ ৭০ হাজার টাকায় একটি গরু কিনে বাড়ি ফিরছেন। তিনি জানান, হাট এখনো পুরোপুরি জমেনি এবং বিক্রেতারা দাম কিছুটা বাড়িয়েই বলছেন। তবে তিনি বেশি দরদাম না করেই গরুটি কিনে নিয়েছেন।
এদিকে রাতের আলোয় হাটের মূল আকর্ষণ হয়ে উঠেছে বিশালাকৃতির বড় গরুগুলো। নারায়ণগঞ্জ থেকে ১৬টি গরু নিয়ে আসা হেদায়েত উল্লাহর ২৬-২৭ মণের একটি গরুর দিকেই সবার নজর। সাত বছর ধরে শখ করে লালন-পালন করা এই পশুটির দাম তিনি চাচ্ছেন ৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা। রাতেও উৎসুক মানুষের ভিড় জমছে তার গরুর চারপাশে, তবে আসল ক্রেতা মিলছে না। পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত দাম উঠলেও হেদায়েত উল্লাহ জানান, সাড়ে ৭ লাখ টাকা পেলেই তিনি এটি ছেড়ে দেবেন, কারণ শখের গরুতে শেষ পর্যন্ত লোকসানই গুনতে হয়।
এদিকে, সাভারের হেমায়েতপুর থেকে ৫টি বড় গরু নিয়ে আসা সাইফুল ইসলামের অবস্থাও একই। প্রতিটি গরুর দাম ৮ লাখ টাকা হাঁকলেও মানুষ শুধু দেখছে আর ছবি তুলছে, কেউ দামাদামি করছে না। তিনি জানান, আজকে রাতে ভালো বেচাকেনার টার্গেট থাকলেও বস্তির আগুনের কারণে বাজার জমেনি। আমরা প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলাম কিন্তু বেশি লোকজন আসেনি।
মিরপুর নান্নু মার্কেট থেকে সহকর্মীদের নিয়ে রাতে হাটে আসা কামরুল হাসান জানান ভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা। আড়াই লাখ টাকার বাজেট নিয়ে কালশী হাটে এসে পছন্দের গরুর দেখা পাননি তিনি। যেগুলো পছন্দ হচ্ছে, সেগুলোর দাম চাওয়া হচ্ছে সাড়ে তিন থেকে চার লাখ টাকা। শেষ পর্যন্ত কালশী হাটে কাঙ্ক্ষিত গরু না পেলে স্টার্ন হউজিং অথবা গাবতলী পশুর হাটে পছন্দের গরুর খোঁজে যাবেন।
